কম্পিউটার বিজ্ঞান গণিত

দ্যা লাস্ট জিনিয়াস : কিছু গাণিতিক-অগাণিতিক কাহিনী

লিবনিজ

১. অসীম হইতে সসীম                                                                                            

\text{1}+\frac{\text{1}}{\text{3}}+\frac{\text{1}}{\text{6}}+\frac{\text{1}}{\text{10}}+\frac{\text{1}}{\text{15}}+\frac{\text{1}}{\text{21}}+ ...........................

দেখাই যাচ্ছে উপরের ধারাটি অসীম।, তার উপর যেমন তেমন অসীম নয়; ধারার পদগুলো একটা আরেকটা থেকে ছোট হয়ে যাচ্ছে। যেমন, 1 এর চেয়ে  \frac{1}{3} ছোট, \frac{1}{3} এর চেয়ে \frac{1}{6} ছোট, \frac{1}{10} আবার তার থেকে ছোট। প্রশ্ন হচ্ছে, ধারার যোগফল কত?

কথাটা শুনে আমরা একটু মাথা চুলকে বলতে পারি, “মোটামুটি ১ এর চেয়ে বড় বুঝা যাচ্ছে।“ যাদের এই রকম অসীম ধারার ব্যাপারে অভিজ্ঞতা আছে তারা বলতে পারে, “যতদূর মনে হয় ২, ৩, ৪ এমন কিছু হবে।“

আমরা এখন চেষ্টা করে দেখতে পারি ধারার যোগফল বের করতে পারি কি না। কিন্তু প্রশ্ন হল, আদৌ কি যোগফল আছে?

অসীম ধারার একটা বড় সমস্যা হল এদের যোগফল থাকতে পারে নাও থাকতে পারে। কেমন করে? দেখা যাক। মনে করি আমাদের একটা অসীম ধারা দেওয়া আছে এরকম-

{{S}_{1}}=1+2+3+4+5+………………………………

বুঝাই যাচ্ছে এই ধারার নির্দিষ্ট কোন যোগফল বের করা সম্ভব না। পদগুলো বড় থেকে বড়ই হচ্ছে বড়ই হচ্ছে। যোগফল নিঃসন্দেহে অসীম। অন্য একটা ধারা {{S}_{2}} দেখা যাক।

                {{S}_{2}}=1+\frac{1}{3}+\frac{1}{9}+\frac{1}{27}+\frac{1}{81}+\frac{1}{243}+...........................

                বা, 3{{S}_{2}}=3+1+\frac{1}{3}+\frac{1}{9}+\frac{1}{27}+\frac{1}{81}+.....................................

                বা, 3{{S}_{2}}=3+{{S}_{2}}

                {{S}_{2}}=\frac{3}{2}

1

{{S}_{2}} ধারার কয়েকটা পদের আংশিক যোগফল আমাদের বের করা যোগফল 3/2 বা 1.5 এর কাছাকাছি যাচ্ছে

এই ধারার পদগুলো বড় হচ্ছে না বরং ছোট হচ্ছে, এবং অত্যন্ত আনন্দের কথা ধারাটার যোগফলও আমরা বের করে ফেলেছি এইমাত্র।  তবে যেহেতু অসীম ধারা তাই যোগফল বলতে কিছুটা অস্বস্তি হতেই পারে, অতএব আরও শুদ্ধ করে বলার ইচ্ছে থাকলে বলা যায়, “পুরো ধারাটাই \frac{3}{2} এর এত কাছাকাছি, এত কাছাকাছি যে পার্থক্যটা ধরাও অসম্ভব”। তাই এখন নির্দ্বিধায় \frac{3}{2} কে অসীম ধারাটার যোগফল বলা যায়। যাদের ক্যালকুলাসের ধারনা ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে, তারা আরও সুন্দর করে বলতে পারে, “{{S}_{2}} ধারার লিমিট \frac{3}{2}”।

কিন্তু যে ধারার পদগুলো বড় থেকে ছোট হয়ে তাদের সবারই কি যোগফল আছে? হারমোনিক সিরিজের কথা ধরা যাক।

1+\frac{1}{2}+\frac{1}{3}+\frac{1}{4}+\frac{1}{5}+\frac{1}{6}+...........................

আগ্রহীরা কাগজ কলম নিয়ে বসে যেতে পারে হারমোনিক সিরিজের যোগফল বের করার জন্য, কিন্তু লাভ নেই। অনেক আগেই প্রমাণ হয়ে গেছে এই ধারাটার কোন সসীম যোগফল বের করা সম্ভব না, একেবারেই সম্ভব না কারণ তেমন কোন যোগফলই নেই।

গাণিতিক ভাষায় আসা যাক। আমরা দেখলাম {{S}_{2}} ধারার একটা যোগফল আছে, আরও ভাল করে বললে যোগফলের একটা লিমিট আছে। মানে ধারার পদগুলো যদি আমরা একটা একটা করে যোগ করতে থাকি তাহলে মানটা \frac{3}{2} কে প্রায় স্পর্শ করে ফেলতে থাকবে কিন্তু \frac{3}{2} এর বেশি হতে পারবে না। এমন যে সব ধারার(অসীম ধারার) যোগফল বের করা যায় তাদের বলে Convergent Series।

আর {{S}_{1}} ধারা? হারমোনিক সিরিজ? যাদের যোগফলের লিমিট অসীম নয়তো একেবারেই নেই তাদের নাম নেই? অবশ্যই আছে, নামটা হচ্ছে Divergent Series।

উপরের সেই ধারাটায় ফিরে যাই। ধারাটার যোগফল কি আছে আদৌ না নেই? ধারাটা কি কনভার্জেন্ট না ডাইভার্জেন্ট?

নিপাত যাক এখন কনভার্জেন্টের কচকচানি। ল্যাটিন ভাষার একটা কবিতার প্রথম চারটা লাইন দিয়ে শুরু করব আমরা একজন মানুষের গল্প।

“Normans enfoncez les tonneaux

Versez ce dangereux breuvage

Qui d’un peuple tranquille et sage

Peut faire un amas de brebaux.”

২. আলোর মাঝে আঁধার

একটা মজার কথা প্রচলিত আছে যে কেউ যদি দুনিয়ার সেরা পাঁচজন বিজ্ঞানীর নাম করে তাহলে যেমন স্যার আইজ্যাক নিউটন থাকবেন, তেমন সেরা পাঁচ গণিতবিদের তালিকাতেও নিউটন থাকবেন। বিজ্ঞান তো আর ধর্ম নয় তবু ধর্মের যেমন ধর্মগ্রন্থ আছে তেমন বিজ্ঞানেরও যদি থাকত তাহলে নির্দ্বিধায় আমরা নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা ডি ন্যাচারালিসকে’ ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের ধর্মগ্রন্থ বলে চালিয়ে দিতে পারি। তবে, আজকের নাটিকার মূল চরিত্র নিউটন নন, অন্য আরেকজন।

যা হোক, ছোটবেলায় পারিবারিক সমস্যার কারণে নিউটনের মানসিকতা অনেকাংশে প্রভাবিত হয়েছিল যার প্রমাণ আমরা পাই তার আজব স্বভাব থেকে। নিউটনের মানুষকে সন্দেহ করার একটা প্রবণতা ছিল। তাই নিজের অনেক কাজকর্ম তিনি প্রকাশ না করে নিজের সাথে রেখে দিতেন সমালোচনা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার জন্য।

যেমন ধরা যাক, ১৬৬০ এর দিকে নিউটন একটা পদ্ধতি বের করেছিলেন যা দিয়ে খুব সহজে কোন একটা বক্ররেখার যে কোন বিন্দুতে ঢাল(ঢাল বলতে বুঝায় ঐ বিন্দুতে বক্ররেখা বা সরলরেখা ঠিক কতটা ঝুঁকে আছে তাকে), কোন জটিল সমীকরণের কাছাকাছি উত্তর, উদ্ভট সব ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল বের করা যায়। পদ্ধতিটা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার জন্য নিউটন একটা বক্ররেখাকে চলমান বিন্দু বা Fluent Point হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন, যে কারণে পদ্ধতিটার নাম হয় ফ্লাক্সিওন বা Fluxion।

নিউটন স্বভাবমতো তার আবিষ্কার নিয়ে টু শব্দও করলেন না। একটা খসড়া পাণ্ডুলিপি অবশ্য ১৬৬৯ সালে বের হয় যেটাকে ১৭৭১ সালে আরও বড়ও করেন নিউটন। দুঃখজনক ভাবে, বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় যে ফ্লাক্সিওন ব্রহ্মাস্ত্র হয়ে উঠতে পারত তার পাণ্ডুলিপি গণিতবিদদের হাতে হাতেই ঘুরতে লাগল কিন্তু আলোর মুখ দেখল না।

মজাটা হল আরও কয়েকটা বছর পর। ১৬৭৬ সালে লন্ডনে এক জার্মান কূটনীতিবিদ হাতে সেই পাণ্ডুলিপিটা পেলেন। তার কয়েক বছর পর সেই জার্মান এমন একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন নাম-ধাম আর চিহ্নগুলো বাদ দিয়ে যা হুবহু ফ্লাক্সিওন! মনে রাখতে হবে যে ইংল্যান্ড-জার্মানির তখন সাপে-নেউলে সম্পর্ক।

এখন এক কাজ করা যাক, ৩৮ বছর আগের জার্মানির লিপজিগ শহরে ফিরে যাই। ঐ বছরে সেই শহরে এক শিশুর জন্ম হয়, এক প্রডিজি, অতি অল্পবয়সে যাদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে। সেই বালক ১৫ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল।

বালকের নাম লিবনিজ আর বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয় যে তার নামের পর ডিগ্রি খুব একটা কম যুক্ত হয়নি যদিও গণিতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বড়ই কম। লিবনিজ হয়ে গেলেন একজন কূটনীতিবিদ আর সেই কূটনৈতিক কাজেই তাকে ১৬৭২ সালে প্যারিস যাত্রা করতে হয়। প্যারিসেই তার দেখা হয় বিজ্ঞানী হাইজেনের সাথে। হাইজেন কেমন করে যেন তরুণ লিবনিজকে চট করে গণিত পাগল বানিয়ে ফেললেন, নয়তো পৃথিবীর বিজ্ঞানের ইতিহাস হয়তো একটু অন্যরকমভাবে লিখতে হতো।

১৬৭৪ এর দিকে লিবনিজ চিন্তা করতে করতে একটা পদ্ধতি বের করেছিলেন যা দিয়ে খুব সহজে কোন একটা বক্ররেখার যে কোন বিন্দুতে ঢাল কোন জটিল সমীকরণের কাছাকাছি উত্তর, উদ্ভট সব ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল বের করা যায়। লিবনিজ আসলে নিউটনের ফ্লাক্সিওনকেই নতুন করে আবিষ্কার করেন যার নাম দেওয়া হয় ক্যালকুলাস!

১৬৭৬ সালে ফ্লাক্সিওনের পাণ্ডুলিপির একটা কপি লিবনিজের হাতে পড়ে ঠিকই কিন্তু নিজের স্বতন্ত্র ক্যালকুলাসই লিবনিজ প্রকাশ করেন ১৬৮৪ সালে, অর্থাৎ নিউটনের পাণ্ডুলিপি পড়লেও ক্যালকুলাস লিবনিজ নিজে নিজেই আবিষ্কার করেছিলেন। নিঃসন্দেহে এ নিয়ে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হল, ক্যালকুলাস বা ফ্লাক্সিওনের সত্যিকারের আবিষ্কারক নিয়ে সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানী আর গণিতবিদেরা ঝগড়ায় মেতে উঠলেন। ঘটনাগুলো এতটাই লজ্জাকর যে বিজ্ঞানের আলোর ইতিহাসের মাঝে ক্যালকুলাস-দ্বন্দ্ব ঘোর আঁধার হয়ে টিকে রয়েছে। সেই অন্ধকার প্রসঙ্গে আমরা নাই গেলাম।

লিবনিজের আরেকটা বড় কাজ ছিল বাইনারি অ্যারিথমেটিক আবিষ্কার যা আজকের কম্পিউটারগুলোর মূলনীতিই বলা চলে। আমরা জানি আধুনিক কম্পিউটারের জনক চার্লস ব্যাবেজ। তার আগে প্যাসকেল যথেষ্ট উন্নত একটা গণনা যন্ত্র ডিজাইন করেছিলেন কিন্তু তা দিয়ে গুণ ভাগ করা যেত না। তাহলে ব্যাবেজই সম্ভবত প্রথম মানুষ যার ডিজাইন করা কম্পিউটার দিয়ে যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ সব করা যেত।

কিন্তু, আসলেই কি তাই?

৩. খাঁজকাটা খাঁজকাটা

2০, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯! দশটা অঙ্ক, ten digits। এই দশটা মাত্র অঙ্ক দিয়ে আমরা যেকোনো সংখ্যা তা সে যত বড়ই হোক না কেন, লিখে ফেলতে পারি। ৯ এর পর ১০, ১১, ১২ তারপর ২০, ৫০, ১০০ চলতেই থাকবে। দশটা অঙ্ক আছে বলে আমাদের এই সংখ্যা লেখার পদ্ধতিটা হচ্ছে দশভিত্তিক বা ডেসিম্যাল সিস্টেম।

প্রশ্ন হচ্ছে, যদি আমাদের কাছে মাত্র দুইটা অঙ্ক ০ আর ১ থাকত তাহলে কি হতো? উত্তরটা হল, আমরা তখন সংখ্যাগুলোকে একটু অন্যভাবে লিখতাম। ০, ১, ১০, ১১, ১০০, ১০১.......এভাবে। পাশের ছকে আমাদের দশভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থার কোন সংখ্যা দুইয়ের ভিত্তিতে কত হবে দেখানো হল। দুই ভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থাই বিখ্যাত বাইনারি সিস্টেম(Binary System) যা ব্যবহার কম্পিউটার কাজ করে।

লিবনিজ বাইনারি পদ্ধতি ব্যবহার করে হিসেব নিকেশ করার উপায়টা প্রথম দেখিয়ে যান। বাইনারি যত বিদঘুটে লাগুক এর হিসেব কিন্তু সবচেয়ে সহজ।

বাইনারি নিয়ে চিন্তা করতে করতেই কি না কে জানে, লিবনিজের মাথায় একটা কম্পিউটার বানানোর বুদ্ধিটা আসে। প্যাসকেল এর কাজের সাথে তিনি ভালভাবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার ডিজাইন করা কম্পিউটার লিবনিজের বেশি পছন্দ হয়নি। কারণ ও দিয়ে কেবল যোগ-বিয়োগ করা যেত, গুণ-ভাগ নয়।

কম্পিউটার বানাবেন বললেই তো আর বানানো যায় না। কম্পিউটার ডিজাইন করতে হয়, আর তখনকার দিনে তো জটিল যন্ত্রপাতিও তার কাছে ছিল না যা দিয়ে সহজে একটা ডিজাইনকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, আর তাই কাজগুলো মানুষেরই নিজের হাতে করতে হত। ডিজাইনের কাজটা লিবনিজ ভালই জানতেন, De Progressione Dyadica তে তিনি একটা যন্ত্রের বর্ণনাও দিয়েছিলেন যা কিনা বাইনারি সিস্টেম মেনে কাজ করে।

কিন্তু গুণ-ভাগ করতে পারে এমন একটা যন্ত্রের অভাব ছিলই আর লিবনিজ ভাল করে জানতেন প্যাসকেলের নীতিগুলো মেনে ওইরকম কোন যন্ত্র বানানো সম্ভব না। আমরা জানি গুণ করার মানে হচ্ছে অনেকবার যোগ করা, তাই লিবনিজ চিন্তা করেছিলেন এমন একটা যন্ত্রের যা যোগ করার কাজটা বারবার করতে পারবে। সে নিয়ে খুঁচাখুঁচি করতে করতেই লিবনিজ উদ্ভাবন করে বসলেন তার বিখ্যাত খাঁজকাটা খাঁজকাটা স্টেপড রেক্যুনার(Stepped Reckoner), সম্ভবত বিশ্বের প্রথম সর্বপ্রথম গণনাযন্ত্র যা দিয়ে গুণ ভাগ করা সম্ভব।

যন্ত্রটা তৈরি করতে গিয়ে লিবনিজ পড়লেন বড় বিপদে। একে তো ভিতরের কলকব্জা মারাত্মক জটিল তার উপর এমন একটা যন্ত্রের কারিগরিতে একবিন্দু ঢিলেমি থাকলেও কি হয়ে যায় বলা যায় না। এত ভাল কারিগর কোথায়। ১৬৭২-৭৩ এর দিকে কাঠ দিয়ে মোটামুটি একটা কাঠামো দাড়া করানো গেল কিন্তু নিজের কাজে স্বয়ং লিবনিজই অসন্তুষ্ট রইলেন।

শেষপর্যন্ত একজন দক্ষ কারিগরকে দায়িত্ব দিলেন লিবনিজ, তিনি প্যারিসে যে এলাকায় থাকতেন সেখানকার ঘড়ি-মেকানিক অলিভিয়ের। অলিভিয়েরই প্রথম ধাতু দিয়ে লিবনিজের জন্য চমৎকার একটা কম্পিউটার-ক্যালকুলেটর-গণনা যন্ত্র তৈরি করে দেন এবং এর পর ভিন্ন ভিন্ন কারিগর দিয়ে লিবনিজ আরও অনেকগুলো যন্ত্র তৈরি করান। দুঃখজনক ভাবে এত বছর পর যা হওয়ার কথা তাই হয়েছে অর্থাৎ সেগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে(কালের অতল গহ্বরে?)। যে কয়েকটি বেঁচে আছে আজও, সেগুলো থেকে বের করা হয়েছে দুনিয়ার সর্বপ্রথম গুণ-ভাগ করা কম্পিউটার, স্টেপড ড্রাম মেকানিজম কেমন করে কাজ করত, কতটা জিনিয়াস ছিলেন এই লিবনিজ, আর তাই আমরা এখন দেখব।

ছবি দুইটা দেখা যাক। ডানপাশের টা একটা একটা স্টেপড ড্রাম, স্টেপড-রেক্যুনারের প্রধান অংশ, এমন অনেকগুলো কব্জা একসাথে জুড়ে পুরো যন্ত্রটি তৈরি হত। নিচের বাঁপাশের ছবিটা একটু জটিল, তাতে কাঠামোটা আরেকটু বিস্তারিত দেখানো হয়েছে।

drum1

drum2

ডানপাশের ছবিতে D চিহ্নিত ডায়ালটিতে ০ থেকে ৯ পর্যন্ত সবগুলো অঙ্ক দেখা যাচ্ছে। আমরা ডায়ালটা ঘুরিয়ে একটা ডিজিট নির্বাচন করতে পারি। ডায়ালটি ঘুরানোর সাথে সাথে E গিয়ারটিও ঘুরতে থাকবে এবং E গিয়ারটি ঘুরাবে M দণ্ডকে যা আবার ঘুরাবে স্টেপড ড্রাম বা যেটি ছবিতে S দিয়ে দেখানো হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি ড্রামের প্রতিটি দাঁতের দৈর্ঘ্য আলাদা তাই D ইনপুট ডায়ালটিকে যতটুকু ঘুরানো হবে হিসেবমত সেই অঙ্কের জন্য নির্ধারিত দাঁতটি  F চাকাকে ঘুরাবে যা আবার R কে ঘুরাবে। এখানে R হচ্ছে বাইরের দিকের অংশ অর্থাৎ গুণফল এখানে দেখা যায়।

এটা বুঝা যাচ্ছে যে লিবনিজের কম্পিউটারের সাথে ঘুরানোর বড় সম্পর্ক আছে কারণ একটা মাত্র ইনপুট ডায়াল ঘুরানোর সাথে সাথে আরও অনেক কিছু ঘুরতে শুরু করেছে। যা হোক, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। লিবনিজের কম্পিউটারে মোট আটটা ইনপুট ডায়াল ছিল তাই আমরা গুণ করার জন্য আট অঙ্কের একটা সংখ্যা প্রবেশ করাতে পারব। ধরা যাক শেষপর্যন্ত একটা সংখ্যা আমরা প্রবেশ করালাম। এবার বড় ছবিটার দিকে লক্ষ করা যাক।

বড় ছবিটাতে দেখা যাচ্ছে একটা স্টেপড ড্রামের সাথে আরেকটা স্টেপড ড্রামের সংযোগ আছে। এবং এই সংযোগ থাকার কারণেই যন্ত্রটি দিয়ে গুণ করা যায়। যন্ত্রটির সামনের দিকে আরেকটা হাতল যুক্ত থাকে যেটা আমরা এখানে দেখতে পারছি না, লিবনিজ হাতলটিকে বলতেন Magna Rota। সেই হাতলটি একবার ঘুরালে সবগুলো স্টেপড ড্রাম একসাথে ঘুরতে থাকে। আমরা যদি একবার বড় হাতলটিকে ঘুরাই তাহলে বাইরের দিকে ইনপুট ডায়ালের মাধ্যমে প্রবেশ করানো সংখ্যাটা দেখা যাবে, অর্থাৎ যে সংখ্যাটা প্রবেশ করানো হয়েছে সেটা আবার দেখা যাবে। আমরা যদি হাতলটি আবার ঘুরাই তাহলে স্টেপড ড্রামগুলো আরেক দফা ঘুরবে এবং আউটপুটের ডিজিটগুলো পরিবর্তিত হতে থাকবে। দ্বিতীয় ঘূর্ণনটি শেষ হওয়ার পর আউটপুটে যে সংখ্যাটি দেখা যাবে সেটা হচ্ছে প্রবেশ করানো সংখ্যাটিকে দুই দ্বারা গুণ করলে যা পাওয়া যায় তা! অর্থাৎ যে সংখ্যা দিয়ে গুণ করতে হবে বড় হাতলটি ততবার ঘুরাতে হবে।

ধরা যাক আমরা ৩২৪ কে ৫ দ্বারা গুণ করব। তাহলে প্রথমেই ইনপুট ডায়াল ঘুরিয়ে ৩, ২, ৪ সংখ্যা তিনটি প্রবেশ করাতে হবে। তারপর বড় হাতলটিকে পাঁচবার ঘুরাতে হবে। তাহলেই আমরা আউটপুটে গুণফল ১৬২০ দেখা যাবে।

সহজ কিন্তু কার্যকর। স্টেপড ড্রাম কম্পিউটার ত্রুটিমুক্ত নয় অবশ্য, কিন্তু তার মাঝে আমরা আপাতত না যাই। যন্ত্রটি দিয়ে গুণ যেমন করা যায় ভাগও তেমনি করা যায়। ভাগ করার জন্য শুধু উল্টো পথ বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ আউটপুট ডায়ালটি ঘুরিয়ে যে সংখ্যাটিকে ভাগ করতে হবে সেটি প্রবেশ করাতে হবে আর উল্টো করে ম্যাগনা রোটা হাতলটি ঘুরিয়ে ইনপুট ডায়ালে ভাগফলটি পাওয়া যাবে।

লিবনিজের স্টেপড রেক্যুনার প্যাসকেলের কম্পিউটার থেকে অনেকগুণ বেশি ভাল(গুণ করতে পারে বলেই অনেকগুণ ভাল)। জিনিসটা ব্যবহার করাও এত সহজ যে ১৬৭৫ সালে ফ্রেঞ্চ সায়েন্স অ্যাকাডেমিতে লিবনিজ যখন যন্ত্রটি দিয়ে কাজ করে দেখান তখন একজন বিজ্ঞানী উৎফুল্ল হয়ে বলে ফেলেন, “লিবনিজের যন্ত্রটা ব্যবহার করে একটা বাচ্চা ছেলেও জটিল জটিল হিসেব করে ফেলতে পারবে!”

কম্পিউটারের বিকাশে লিবনিজের অবদান এখানেই শেষ নয়। তবে আপাতত কম্পিউটার থেকে দূরে লিবনিজের ক্যালকুলাসে যাওয়া যাক। পরের অংশে যাওয়ার আগে বলে রাখি, ওই অংশটা বুঝার জন্য ক্যালকুলাসের ধারনা থাকা প্রয়োজন। ক্যালকুলাস সম্পর্কে কোন জ্ঞানই যদি না থাকে তবে নির্দ্বিধায় পাঠক পরবর্তী অংশটুকু বাদ দিয়ে যেতে পারে কারণ সেখানে কেবল কিছু গাণিতিক হিসেব করা হবে, আর কিছু নয়। আর সেই জটিল গাণিতিক হিসেবগুলো করে আমরা বের করে আনব প্রথমে দেখানো সেই ধারাটি ডাইভার্জেন্ট না কি কনভার্জেন্ট।

৪. ক্ষেত্রফল বনাম ক্ষেত্রফল

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই অংশের উদ্দেশ্য সেই ধারাটা কনভার্জেন্ট না ডাইভার্জেন্ট তা বের করা তাই এবার কোন বাড়তি আলোচনা নয়, সরাসরি কাজে চলে যাব। সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ধারাটি আবার লিখে ফেলা যাক-

S=\text{1}+\frac{\text{1}}{\text{3}}+\frac{\text{1}}{\text{6}}+\frac{\text{1}}{\text{10}}+\frac{\text{1}}{\text{15}}+\frac{\text{1}}{\text{21}}+...........................

ধারাটার পদগুলোর হর লক্ষ করা যাক। প্রথম পদটি 1 এবং হর দেখানো না হলেও বুঝা যাচ্ছে হর 1। দ্বিতীয় পদটির হর 3=1+2, তৃতীয় পদটির হর 6=1+2+3, চতুর্থ পদটির হর 10=1+2+3+4। যেহেতু 1 থেকে n পর্যন্ত পূর্ণসংখ্যাগুলোর যোগফল \frac{n(n+1)}{2}, তাই ধারাটির n তম পদ \frac{1}{\frac{n(n+1)}{2}}=\frac{2}{n(n+1)}

আচ্ছা ধারাটির n তম পদটিকে আমরা একটা ফাংশন হিসেবে লিখে ফেলি যেখানে f(n) = \frac{2}{n(n+1)}, যেখানে n হিসেবে যেকোনো পূর্ণসংখ্যা ব্যবহার করলেই আমরা S ধারার n তম পদ পেয়ে যাব। যদিও আমরা যদি পূর্ণসংখ্যা না বসাই তবেও ফাংশনের একটা মান পাওয়া যাবে, সেটা ধারাটির পদ হবে না এই আর কি।

নিচে যে দুটো গ্রাফ দেওয়া আছে তাদের মাঝে বক্ররেখাটা হচ্ছে f(n) এর গ্রাফ। তবে f(n) এর সত্যিকারের গ্রাফ আঁকলে মোটেও এরকম হবে না যেটা আগেই বলে রাখা দরকার, আমাদের কোনমতে কাজ চালালেই হচ্ছে তাই যেমন তেমন একটা গ্রাফ এঁকে ফেলেছি।

4

5

ফাংশনটা আসলে অসীম পর্যন্ত আঁকা হয়েছে, আর প্রতিটা ছবিতেই আমরা দেখতে পারছি কিছু আয়তক্ষেত্র আঁকা হয়েছে

যাদের সংখ্যা অসীম; আর অবশ্যই যেহেতু অসীম সংখ্যক আয়তক্ষেত্র এঁকে দেখানো সম্ভব না তাই কয়েকটা এঁকেই থেমে যেতে হয়েছে। প্রথমেই আমরা বের করব f(n) x-অক্ষের সাথে 1 থেকে \infty ব্যবধিতে কি পরিমাণ ক্ষেত্রফল দখল করে আর এ ক্ষেত্রে আমাদের অস্ত্র হবে ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস। ফাংশনটির ইন্টিগ্রেশন বা সমাকলন করে পাই-

\int\limits_{1}^{\infty }{f(n)dn=\int\limits_{1}^{\infty }{\frac{2}{n(n+1)}dn=}}2\ln 2

দেখা যাচ্ছে ক্ষেত্রফল সসীম। এখন প্রথম ছবিটা দেখে বুঝা যাচ্ছে আয়তক্ষেত্রগুলোর মোট ক্ষেত্রফল f(n) এর দ্বারা দখলকরা ক্ষেত্রফলের চেয়ে বেশি আর দ্বিতীয় ছবিটায় কম। প্রথম ছবির n তম আয়তের ক্ষেত্রফল হবে 1 x f(n), যেহেতু আয়তক্ষেত্রগুলো 1 একক দূরে দূরে আঁকা হয়েছে এবং আয়তের উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে f(n)। যদি প্রথম ছবির সবগুলো আয়তের যোগফল নেওয়া হয় তাহলে পাওয়া যাবে

                {{A}_{1}} = 1 x f(1) + 1 x f(2) + 1 x f(3) + 1 x f(4) + 1 x f(5) + 1 x f(6)+……………

                {{A}_{1}} = \text{1}+\frac{\text{1}}{\text{3}}+\frac{\text{1}}{\text{6}}+\frac{\text{1}}{\text{10}}+\frac{\text{1}}{\text{15}}+\frac{\text{1}}{\text{21}}+………………………..

আয়তক্ষেত্রগুলোর ক্ষেত্রফলের যোগফল আসলে সেই ধারাটাই! আমরা যদি f(n) সমাকলন করে একটা অসীম ক্ষেত্রফল পেতাম তাহলে দেখানো যেত যেহেতু আয়তক্ষেত্রগুলোর ক্ষেত্রফলের যোগফল ফাংশন দ্বারা দখল করা ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের বেশি তাই ধারার যোগফলও অসীম; ধারাটি ডাইভার্জেন্ট। কিন্তু তা হচ্ছে না, অতএব আমরা অন্য ছবিটির দিকে মনোযোগ দেই।

দ্বিতীয় ছবিটিতে যে আয়তক্ষেত্রগুলো তাদের প্রস্থও 1 এবং উচ্চতা f(n), কিন্তু n এর মান শুরু হয়েছে 2 থেকে। তারমানে n তম আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল 1 x f(n+1)। আগের বারের মতই সবগুলো ক্ষেত্রফল যোগ করে ফেলি,

                {{A}_{2}} = 1 x f(2) + 1 x f(3) + 1 x f(4) + 1 x f(5) + 1 x f(6)+……………

                {{A}_{2}}= \frac{\text{1}}{\text{3}}+\frac{\text{1}}{\text{6}}+\frac{\text{1}}{\text{10}}+\frac{\text{1}}{\text{15}}+\frac{\text{1}}{\text{21}}+………………………..

                {{A}_{2}}+1= 1+\frac{\text{1}}{\text{3}}+\frac{\text{1}}{\text{6}}+\frac{\text{1}}{\text{10}}+\frac{\text{1}}{\text{15}}+\frac{\text{1}}{\text{21}}+………………………..

{{A}_{2}}+1 হচ্ছে আমাদের ধারাটি। আবার দেখানো যায় যে,

                {{A}_{2}} \langle 2 ln 2

                {{A}_{2}}+1 \langle 2 ln 2 + 1

                {{A}_{2}}+1 \langle ln  4e

ln 4e এর মান সসীম এবং {{A}_{2}}+1 বা S এর মান এর থেকে ছোট, তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় ধারাটির যোগফলও সসীম অর্থাৎ ধারাটি কনভার্জেন্ট! কাজ হয়ে গেছে আমরা এখন জানি ধারাটির যোগফল বের করা যাবে।

আমরা যে পদ্ধতি ব্যবহার করে ধারার যোগফল বের করলাম তার নাম হচ্ছে ইন্টিগ্রাল রুল। দুই ক্যালকুলাস কিংবদন্তী কশি ও ম্যাকলরিন পদ্ধতিটা দাড়া করিয়েছিলেন বলে একে কশি-ম্যাকলরিন রুলও বলা যায়। একই পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা যে কোন অসীম ধারা কনভার্জেন্ট না ডাইভার্জেন্ট বের করে ফেলতে পারব।

ক্যালকুলাস দিয়ে যে সব চমৎকার করা যায় তার মাঝে ইন্টিগ্রাল রুল খুবই সামান্য। ক্যালকুলাসের দুই আবিষ্কারক স্যার আইজ্যাক নিউটন এবং আমাদের আজকের নাটকের নায়ক গটফ্রেড উইলহেম লিবনিজকে স্যালুট জানিয়ে পরবর্তী অংশে যাওয়া যাক।

৫. THE LAST GENIUS

ফ্রান্সে থাকাকালে বিজ্ঞানী হাইগেন ছিলেন লিবনিজের সবচেয়ে ভাল বন্ধু। নিজের তরুণ সাথীর মেধা পরীক্ষা করার জন্য হাইজেন তাকে একটা গাণিতিক সমস্যা তুলে দেন। লিবনিজ কিন্তু তখনও গণিতবিদ লিবনিজ নামে আত্মপ্রকাশ করেননি। হাইজেন এর গাণিতিক সমস্যাটা ছিল এরকম,

\text{1}+\frac{\text{1}}{\text{3}}+\frac{\text{1}}{\text{6}}+\frac{\text{1}}{\text{10}}+\frac{\text{1}}{\text{15}}+\frac{\text{1}}{\text{21}}+……………………….অসীম ধারাটির যোগফল বের করতে হবে”

লিবনিজ চিন্তা করলেন চিন্তা করলেন, শেষপর্যন্ত তিনি যা করলেন তা হল ধারাটিকে একটু বদলে লিখলেন,

                S = \text{1}+\frac{\text{1}}{\text{3}}+\frac{\text{1}}{\text{6}}+\frac{\text{1}}{\text{10}}+\frac{\text{1}}{\text{15}}+\frac{\text{1}}{\text{21}}+………………………..

                বা, S = 2\left( \frac{1}{2}+ \right.\frac{\text{1}}{\text{6}}+\frac{\text{1}}{\text{12}}+\frac{\text{1}}{\text{20}}+\frac{\text{1}}{\text{30}}+\frac{\text{1}}{\text{42}}+………………\left. \frac{{}}{{}} \right)

                বা, S = 2\left( \left[ {} \right.1-\frac{1}{2}\left. {} \right]+ \right.\left[ {} \right.\frac{\text{1}}{\text{2}}-\frac{1}{3}\left. {} \right]+\left[ {} \right.\frac{\text{1}}{\text{3}}-\frac{1}{4}\left. {} \right]+\left[ {} \right.\frac{\text{1}}{\text{4}}-\frac{\text{1}}{\text{5}}\left. {} \right]+\left[ {} \right.\frac{\text{1}}{\text{5}}-\frac{1}{6}\left. {} \right]………………\left. \frac{{}}{{}} \right)

                বা, S = 2\left( 1-\frac{1}{2}+ \right.\frac{\text{1}}{\text{2}}-\frac{1}{3}+\frac{\text{1}}{\text{3}}-\frac{1}{4}+\frac{\text{1}}{\text{4}}-\frac{\text{1}}{\text{5}}+\frac{\text{1}}{\text{5}}-\frac{1}{6}………………\left. \frac{{}}{{}} \right)

                বা, S = 2

লিবনিজের ইন্টিগ্রাল রুল ব্যবহার করে বের করা সম্ভব ছিল না ধারাটির যোগফল আদৌ আছে কি না কারণ তিনি তখনও ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেননি। তবুও খুব সহজ উপায়ে গাণিতিক সমস্যাটার সমাধান তিনি করে ফেললেন আর এই ঘটনাই লিবনিজের জীবন আবার গণিতের ইতিহাসকেই পাল্টে দিল। অসীম ধারা ছিল লিবনিজের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়গুলোর একটি আর সেই অসীম ধারা নিয়ে চিন্তা করতে করতেই লিবনিজ আবিষ্কার করে ফেললেন তার ক্যালকুলাস!

লিবনিজ যদি ক্যালকুলাস আবিষ্কার না করতেন তাহলে কি হতো বলা মুশকিল। নিউটনের ফ্লাক্সিওন প্রকাশ হতে হতে কতদিন লাগত এমনকি প্রকাশ হতোও কি না তাও বলা যায় না। লিবনিজ নতুন করে ক্যালকুলাস আবিষ্কার না করলে পৃথিবীর মানুষ বিজ্ঞানের ব্রহ্মাস্ত্র থেকে বঞ্চিত থাকত অনেকগুলো বছর, হয়তো অনেকগুলো শতাব্দী। কিন্তু তা হয়নি।

7লিবনিজের আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি দারুণ দারুণ সব চিহ্নের আইডিয়া বের করে ফেলতেন। আমরা আজকাল সমাকলন বুঝানোর জন্য যে \int চিহ্ন ব্যবহার করি, সেটা নিউটনের ক্যালকুলাস থেকে আসেনি এসেছে লিবনিজের ক্যালকুলাস থেকে। ব্যবকলনের জন্য যে \frac{d}{dx} চিহ্নটি ব্যবহার করি সেটাও লিবনিজের। নিউটন হয়তো লিবনিজের আগে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেছেন কিন্তু আজ যে ক্যালকুলাস দুনিয়ার প্রতিটি বিজ্ঞানী, গণিতবিদ এমনকি ছাত্ররা ব্যবহার করে সেটা নিউটনের ক্যালকুলাস নয়, লিবনিজের ক্যালকুলাস। কিন্তু নিউটনের ছায়ায় পড়ে লিবনিজের নাম একরকম হারিয়ে গেছে যেটা হওয়া উচিৎ ছিল না।

চিহ্নের উপর লিবনিজের মেধার কথা বলা হয়েছে, তার অন্য চিন্তাগুলোর কথা না বললে অবিচার করা হবে। লিবনিজের ইচ্ছে ছিল এক মহাজাগতিক ভাষা তৈরি করার, যে ভাষা সবাই বুঝতে পারবে, যে ভাষায় যুক্তি লিখে ফেলা যাবে। তিনি সেই কাজ করতে পারেননি কিন্তু তার যুক্তি লেখার বুদ্ধিই আজ ব্যবহার করা হচ্ছে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এ।

যদি আর কিছুদিন আগে বা আর কিছুদিন পরে জন্মগ্রহন করতেন তাহলে বিজ্ঞানের কিংবদন্তী হিসেবে আমরা হয়তো লিবনিজের নামও শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করতাম। কিন্তু নিউটনের সমসাময়িক হয়েই লিবনিজের আলোতে আসা হল না। তবু তার মেধা কোন অংশে কম ছিল না, যে কারণে আজ লিবনিজ কে ডাকা হয় দ্যা লাস্ট জিনিয়াস (The Last Genius)।

লিবনিজ কেন জিনিয়াস তার কিছু প্রমাণ আমরা পেলাম। আরও অনেক কাজ আছে তার, অ্যালকেমি, থিওলজির উপর অনেক কিছু তিনি করে গেছেন। লিবনিজ কবিও ছিলেন। প্রথম অংশের শেষে যে ল্যাটিন কবিতাটি দেওয়া আছে তা লিবনিজের। উত্তরের মানুষের উদ্দেশ্যে লিখা কবিতাটির একটি আনাড়ি বাংলা অনুবাদ দিয়ে ইতি টানা যাক দুনিয়ার শেষ জিনিয়াসের গাণিতিক-অগাণিতিক কাহিনীগুলো।

তোমাদের পিপেগুলো ভেঙে ফেল নর্মন

ঢেলে ছুড়ে দাও বিষাক্ত মদ যত,

যে বিষ চিন্তা করা মানুষে শতশত

বোকার জাতিতে করে দেয় পরিবর্তন।

 

তথ্যসূত্র:
[1] Mathematical Universe – William Dunham
[2] http://www.jehsmith.com/philosophy/2011/06/some-poetry-by-leibniz.html
[3] http://www.maths.tcd.ie/pub/HistMath/People/Leibniz/RouseBall/RB_Leibnitz.html
[4] http://history-computer.com/MechanicalCalculators/Pioneers/Lebniz.html
[5] http://www.sosmath.com/calculus/improper/convdiv/convdiv.html
[6] http://tutorial.math.lamar.edu/Classes/CalcII/IntegralTest.aspx
[7] http://en.wikipedia.com
স্টেপড ড্রাম ও লিবনিজের ছবি:
[8] http://history-computer.com/MechanicalCalculators/images/Leibniz_stepped_drum.jpg
[9] http://history-computer.com/MechanicalCalculators/images/Leibnic-machine-carry.jpg
[10] http://www.iep.utm.edu/wp-content/media/leibniz.jpg

এই লেখাটি বিজ্ঞান স্কুল ম্যাগাজিন ১ থেকে

About the author

মৃন্ময় আকাশ

আপাতদৃষ্টিতে অযৌক্তিক পৃথিবীর যুক্তি অন্বেষনে।

Leave a Comment